ঐশী ইসলাম:
রাজশাহী কলেজের সবুজ প্রাঙ্গণ এখন প্রাণবন্ত ও রঙিন। শিক্ষার্থীদের হাসি, উচ্ছ্বাস এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে মুখরিত এই প্রাঙ্গণে চলছে সৃজনশীল মেলা। এই মেলা শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি প্রতিভা ও প্রেরণার এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।
মেলার প্রতিটি কোণা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সাক্ষ্য বহন করছে। চিত্রকলা, বিজ্ঞান প্রকল্প, ও সঙ্গীত প্রতিযোগিতা সহ নানান সেকশন মেলাকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়।
এই মেলা শিক্ষার্থীদের মাঝে শুধুমাত্র সৃজনশীল চিন্তা এবং কর্মের প্রতি উৎসাহ সঞ্চারিত করে না, বরং তাদের মাঝে এক প্রগাঢ় সম্প্রীতি এবং সহযোগিতার বন্ধন সৃষ্ট করে। এখানে শিক্ষার্থীরা তাদের সীমানা ছাড়িয়ে চিন্তা করে, নতুন কিছু সৃষ্টির প্রেরণা পায় এবং তাদের প্রতিভা বিকশিত হয়।
মেলার এক কোণে দেখা মিলল চিত্রকলা প্রদর্শনীর, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের অনুভূতি ও চিন্তাকে রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে, বিজ্ঞান প্রকল্প প্রদর্শনী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী মনস্তাত্ত্বিক ধারা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে তুলে ধরে।
সৃজনশীল মেলা শুধু একটি দিনের জন্য নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা, একটি শিক্ষা, একটি প্রেরণা যা শিক্ষার্থীদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রাখে। এটি তাদেরকে শেখায় যে, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবন শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি জীবনের প্রতিটি দিকে প্রযোজ্য।
রাজশাহী কলেজের সৃজনশীল মেলা প্রমাণ করে যে, যখন প্রতিভা ও প্রেরণা একসাথে মিলে যায়, তখন সৃষ্টি হয় এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। এই মেলা নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পথচলায় এক অনুপ্রেরণার উৎস।
এমন এক সৃজনশীল মেলার আয়োজন করেছে রাজশাহী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্লাব অফ ইকোনমিক্স। চলবে দুই দিন ব্যাপী।
মেলার উদ্বোধন করেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফসর মোহাঃ আব্দুল খালেক এবং সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাসুদ পাইলট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার গুরুত্ব উপর জোর দেন।
এই মেলার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃজনশীল চিন্তা ও উদ্যোক্তা হওয়ার প্রেরণা জাগানো। মেলায় মোট ১৯টি স্টল রয়েছে যেগুলো বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা প্রদান করছে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী স্টলগুলো মধ্যে রয়েছে বইয়ের দোকান, মাছের একুরিয়াম, বিভিন্ন প্রকার গাছ, শাড়ি, পাঞ্জাবি, পিঠা, মাটির হাড়ি-পাতিল, বুটিকস ও খালি হাতে সেলাই করা কাপড়ের দোকান। প্রদর্শিত পণ্যগুলো শিক্ষার্থীদের স্বল্প পুঁজি ও নিজস্ব চিন্তা-ভাবনায়।

অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ইয়াছিন আরাফাত সর্বোচ্চ বারো হাজার টাকা পুঁজিতে অ্যাকুরিয়ামের স্টল খুলেছেন। তিনি জানান, প্রতিটি একুরিয়াম তৈরির খরচ প্রায় একশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত হয়। অ্যাকুরিয়ামের পাশাপাশি তারা মাছ এবং পাখির ব্রিডিংও করে থাকেন, যার মধ্যে রয়েছে লাভ বার্ড, বাজুরিকা প্রভৃতি। এছাড়া, তারা খরগোশও বিক্রি করে। তাদের মূল ব্যবসা অনলাইনে বিভিন্ন পেজের মাধ্যমে চলে। অ্যাকুরিয়াম তৈরি থেকে পাখির ব্রিডিং পর্যন্ত সবকিছু নিজেদের করার কারণে, বাজারের তুলনায় শিক্ষার্থীরা এখান থেকে অনেক কম দামে তাদের পছন্দের জিনিস ক্রয় করতে পারছে।
সৃজনশীল মেলা সম্পর্কে ক্লাব অফ ইকোনমিক্স এর আহ্বায়ক পারভেজ পিয়াস বলেন, “এই মেলা আমাদের সৃজনশীল প্রতিভা এবং উদ্যোগী চিন্তাভাবনা প্রদর্শনের এক অনন্য মঞ্চ। এটি শুধুমাত্র আমাদের ছাত্রদের জন্য নয়, বরং সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য একটি শিক্ষামূলক এবং উপভোগ্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। প্রতিবছরই এ ধরনের মেলা আমাদের উদ্যোগে হয়ে থাকে। তবে এ বছর মেলাটির একটু বড় করে আয়োজন করা হয়েছে। মেলাতে নিজস্ব উদ্যোগে সবাই নিজস্ব অর্থায়নে সকল কিছু তৈরি করেছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন নয়, রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা যেন সৃজনশীল হয়ে উদ্যোক্তা হতে পারে এটাই এই সৃজনশীল মেলার সার্থকতা। কলেজ প্রশাসন যদি সার্বিকভাবে আমাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করে, তাহলে পরবর্তী বছর থেকে সৃজনশীল মেলাটি আরো বড় পরিসরে করতে পারব এবং সাধারণদের জন্য ও স্টল দিতে পারব।
অর্থনীতি বিভাগের ক্লাব অফ ইকোনোমিক্স দ্বারা আয়োজিত সৃজনশীল মেলাকে একটি মহৎ উদ্যোগ বলে মন্তব্য করে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ মোহাঃ আব্দুল খালেক বলেছেন, প্রতি বছর এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে, ক্লাব অফ ইকোনোমিক্স পারম্পরিক পিঠার মেলা থেকে ভিন্ন, নতুন কিছু উদ্ভাবনের দিকে ধাপ নিয়েছে। এই মেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা না শুধু পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে, বরং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করার পথও খুঁজে পাচ্ছে। তাদের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দিচ্ছে, যা রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গৌরবের বিষয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজশাহী কলেজ বঙ্গবন্ধু কন্যার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ তৈরির লক্ষ্যে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে।
